সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পরিবেশ দূষণের কারণ ও তার প্রতিকার

পরিবেশ দূষণের কারণ ও তার প্রতিকার

পরিবেশ দূষণ ঃ

প্রাকৃতিক কারণে অথবা মানুষের কার্যকলাপে উদ্ভূত দূষিত পদার্থ পরিবেশকে বিষময় করে তোলে। পরিবেশের প্রাকৃতিক উপাদান, যেমন মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব পরিবর্তন ঘটে যা জীবজগতের উপর ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে। এটিকে পরিবেশ দূষণ বলে। 

পরিবেশ দূষণের কারণ ঃ

১। জনসংখ্যা বৃদ্ধি : 

ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বনজঙ্গল কেটে বসতবাড়ি তৈরি করা হয়। ফলে বৃষ্টিপাত কমে, স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে কলুষিত হয়, অধিক খাদ্য উৎপাদন করতে অধিক কীটনাশক ও সার ব্যবহার করতে হয়। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

২। নগরায়ন :

নগরায়নের ফলে কলকারখানা ও গাড়ি বাড়ছে। ফলে কালো ধোঁয়া বায়ু দূষণের সৃষ্টি করছে। গাড়ির হর্ণ থেকে শব্দ দূষণ হচ্ছে। আবার নদীর পানিতে কলকারখানার আবর্জনা মিশে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে।

কাজের আশায়  শহরে এলে বস্তি গড়ে উঠে। এই বস্তিতে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সমস্যা ও ময়লা-আবর্জনা ফেলার অব্যবস্থা ও সচেতনতার অভাব পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। 

৩। জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট সমস্যা :

সমগ্র বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। কারণ গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দুই মেরুর  বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। 

এছাড়া খরা, নদীর প্রবাহ হ্রাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, পানযোগ্য জলের অভাব, মৎস্যসম্পদ ধ্বংস, ফসল উৎপাদন হ্রাস, ভূমিকম্প ইত্যাদি ভয়াবহ দুর্যোগে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

৪। বনজ সম্পদ ধ্বংস :

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি দেশের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু নগরায়ণ, শিল্পায়ন, জ্বালানি সংগ্রহ ও কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে, জ্বালানি, বাড়িঘর, আসবাবপত্র নির্মাণ ইত্যাদি প্রয়োজনে ব্যাপকহারে বনজ সম্পদ উজাড় হচ্ছে। ফলে ভূমিক্ষয় হয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

৫। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন

অপরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন, যেমন খাদ্যসামগ্রী তৈরির কারখানার পাশে সার ও কীটনাশক তৈরি কারখানা হলে পানি ও বায়ু দূষণ ঘটে। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে।

৬। অপরিকল্পিত বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন

শিল্পকারখানা, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সেগুলো মাটিতে শোষিত হচ্ছে বা পার্শ্ববর্তী জলাধারে গিয়ে পড়ছে, ফলে মাটি ও জল দূষিত হচ্ছে।

৭ । নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট :

নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হওয়ার ফলে বৃষ্টির পানি সরে যেতে পারে না, জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, ফলে পরিবেশ দূষিত হয়।

৮। ইটভাটা :

নগরায়নকে কেন্দ্র করে কোনো নিয়মনীতি ছাড়া এদেশে অসংখ্য ইটভাটা গড়ে উঠেছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইটভাটায় কাঠ ব্যবহারের ফলে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে এবং ইট পোড়ানোর ফলে বায়ুতে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৯। অচল ও অধিক যানবাহন ব্যবহার

অচল ও অধিক যানবাহন ব্যবহারের ফলে অধিক জ্বালানি ব্যবহৃত হলে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ সৃষ্টি হয়।

১০। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার :

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে গিয়ে কৃষি কাজে অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে, ফলে মাটি ও বায়ুদূষণ ঘটছে।

১১। ভূমি ক্ষয়

নগরায়ন, পাহাড় কাটা, জলাশয় থেকে নুড়ি-বালু, পাথর উত্তোলন, বনজ সম্পদ ধ্বংস ইত্যাদি কারণে ভূমিক্ষয় হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পরিবেশ দূষণের সৃষ্টি হচ্ছে।

পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ ঃ

নিচে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধের সম্ভাব্য উপায়সমূহ উল্লেখ করা হলো।

১। জোরালো প্রচার :

দেশের আপামর জনসাধারণকে পরিবেশ দূষণের কারণ ও তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ করার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে, যেমন- রেডিও-টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও সেমিনারের মাধ্যমে জোরদার প্রচার চালানো। 

২। পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তি :

শিক্ষার মাধ্যমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে 'পরিবেশ দূষণ'কে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারিভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

৩। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড :

দেশের প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটে 'পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড গঠন করে সামাজিক সংগঠনসমূহ যাতে প্রতি মাসে অন্তত একটি সেমিনার আয়োজন করে সচেতনতা বারান দরকার।

৪। জমি জরিপ শিল্পের অনুমোদন:

দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রাক্কালে যথাযথ জরিপ ও উপযোগিতা যাচাইয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সুপারিশ গ্রহণের বিধান বাধ্যতামূলক করা।

৫। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা :

জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের সর্বত্র স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকার জন্য এদের কার্যকলাপের মূল্যায়ন সাপেক্ষে উৎসাহজনক পুরস্কারের ব্যবস্থা করা।

৬। বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ :

পরিবেশ দূষণের হাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার সর্বোত্তম হাতিয়ার হচ্ছে দেশের সর্বত্র প্রচুর গাছপালা লাগানো ও বনভূমির নির্বিচার নিধন রোধে আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ। 

৭। আবাসিক এলাকার বাইরে শিল্প :

নগরীর আবাসিক এলাকার বাইরে শিল্প কারখানা স্থাপন করা গেলে এই সমস্যার অনেকাংশে সমাধান পাওয়া যাবে।

৮) বস্তিবাসীর পুনর্বাসন:

সর্বোপরি বস্তি এলাকার অধিবাসীদেরকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পুনর্বাসন করতে হবে, তা না হলে শহর ও নগরসমূহ দূষণমুক্ত হবে না।

৯। দূষিত পদার্থের নিরপেক্ষকরণ :

বায়ুদূষণ হতে পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে দূষিত পদার্থ নির্গত হওয়ার সময় এতে এমন পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে দিতে হবে যাতে এরা বায়ুকে দূষিত করার পূর্বেই নিরপেক্ষ (neutral) হয়ে যায়।  জাপান এসিড বৃষ্টি প্রতিরোধকল্পে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে সফলতা লাভ করেছে।

১০। ধোঁয়া রোধক যন্ত্র :

সীসামুক্ত পেট্রোল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মটরযানে নির্গত ধোঁয়া ও বিকট শব্দের জন্য নিরোধক যন্ত্র লাগান দরকার। এভাবে হাইড্রলিক হর্ণের পরিবর্তে শব্দ দূষণরোধে মিউজিক হর্ণ ব্যবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে।

১১। কৃষিতে জৈবিক পদ্ধতি প্রয়োগ :

পানিকে দূষণের হাত হতে রক্ষা করার জন্য ফসল ক্ষেতে কীটনাশক ও আগাছানাশক ঔষধের ব্যবহার কমিয়ে জৈবিক (Biological) পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

১২। পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার উন্নতি :

দেশের নগরসমূহের পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, পৌর আবর্জনা ও জঞ্জাল স্থানান্তর এবং পরিষ্কারের জন্য আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ, শহর এলাকার নালা-নর্দমার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি কড়াকড়ি আরোপ ও নজরদারীর জন্য পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা যায়।

ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা ঃ

দূষণমুক্ত পরিবেশ রক্ষায় ছাত্র সমাজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিম্নলিখিত করণীয় বিষয়ে পরিবারকে নির্দেশনা দিতে পারে :

ক) ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ :

১. পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা। পরিবারের প্রতিদিনের বর্জ্য বা ময়লা যেন পরিবেশ দূষণ না করে, এ ব্যাপারে পরিবারের সদস্যদের সচেতন করতে হবে। 
২. প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ
৩. ক্ষতিকর সিনথেটিক বর্জন। যেসব আবর্জনা বিনষ্ট হয় না তা কম ব্যবহার করা। যেমন-প্লাস্টিকের ব্যাগ
৪. নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার
৫. উন্নয়ন ও দূষণমুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার। মশা, মাছি, ইঁদুর, তেলাপোকা নিধনে ডি.ডি.টি পাউডার, কয়েল, এ্যারোসোল ইত্যাদির ব্যবহার কমাতে হবে। রাসায়নিক দ্রব্য কম ব্যবহার করা। 
৬. গাছ লাগানো। বাড়ির আশেপাশের পরিবেশ যেন ঠিক থাকে সেজন্য ছোট বড় গাছপালা রোপণ করতে হবে।
৭. টেলিভিশন ও ক্যাসেট প্লেয়ার জোরে না বাজানো
৮) পরিকল্পিত পরিবার গড়ে তুলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে হবে।
৯) নিজের চাওয়াকে ত্যাগ করে সমাজের কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। ধূমপানের অভ্যাস না করা।
১০) পরিবারে গাড়ি থাকলে অবশ্যই দৃষ্টি রাখতে হবে যেন গাড়ি থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত না হয়।
১১) সর্বোপরি দূষণমুক্ত পরিবেশ রক্ষার সুষ্ঠুনীতি ও আইন ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।

সমষ্টিগত উদ্যোগ গ্রহণ :

উপরোক্ত বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছাত্র সমাজ সমষ্টিগতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।
এই সব বিষয়ে ১) আলোচনা সভা, ২) পথনাটিকা, ৩) ব্যানার ও পোস্টার লাগানো, ৪) বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচার চালানো, নিজ নিজ বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য নির্মল বিদ্যালয় প্রকল্পে অংশগ্রহণ ইত্যাদি।

উপসংহার :

সুতরাং  স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিবেশ বিষয়ে শিক্ষা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ হল গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের বিশেষ করে ছাত্র সমাজের মধ্যে যথাযথ সচেতনা সৃষ্টি ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার ও জনগণের মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ কার্যক্রম সফল হওয়া সম্ভব।



মন্তব্যসমূহ

বাংলা বই : দ্বাদশ শ্রেণি - সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রশ্নোত্তর

প্রবন্ধ : ভগিনী নিবেদিতা

ভগিনী নিবেদিতা ভূমিকা : ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ভগিনী নিবেদিতার নাম। পৈত্রিক সূত্রে তিনি ছিলেন স্কচ। আধুনিক ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী ও ধর্মনেতা স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতবর্ষে আসেন। ব্রহ্মচর্যে দীক্ষা নেন। ভারতে সমাজ সেবা ও নারী শিক্ষার প্রসারেও নিবেদিতার ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জন্ম ও বংশ পরিচয় : ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ অক্টোবর উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডানগ্যানন শহরে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল ছিলেন ধর্মযাজক। মায়ের নাম মেরি ইসাবেলা। মাত্র দশ বছর বয়সে মার্গারেটের বাবা মারা যান। তারপর তাঁর দাদামশাই তথা আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হ্যামিলটন তাঁকে লালনপালন করেন। শিক্ষাজীবন : মার্গারেট লন্ডনের চার্চ বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। এরপর হ্যালিফ্যাক্স কলেজে তিনি ও তাঁর বোন মেরি পড়াশোনা করেছিলেন। কর্মজীবন : ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে, সতেরো বছর বয়সে শিক্ষাজীবন শেষ করে মার্গারেট শিক্ষিকার পেশা গ্রহণ করেন। দু’বছরের জন্যে কেসউইকের একটি প্রাইভেট স্কুলে পড়ান। এরপরে একে ...

ছাত্র জীবনে সৌজন্য ও শিষ্টাচার

ছাত্র জীবনের সৌজন্য ও শিষ্টাচার মানব জীবনে শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভদ্রতা আত্মীয়তার চেয়ে কিছু কম এবং সামাজিকতার চেয়ে কিছু বেশি। - ইন্দিরাদেবী চৌধুরাণী ভূমিকা? ইংরেজীতে যাকে বলে Etiquette; good manners; formality; বাংলায় তাকেই বলে শিষ্টাচার। মানবজীবনের অত্যাবশ্যক গুণাবলির অন্যতম হল এই সৌজন্য ও শিষ্টাচার। দেহের সৌন্দর্ৎ বৃদ্ধি পায় যেমন অলঙ্কারে, তেমনি আত্মার সৌন্দর্য বাড়ে শিষ্টাচারে। অলঙ্কার বাইরের সামগ্রী আর শিষ্টাচার অন্তরের। এবং সৌজন্যবোধ হলো তার মার্জিত প্রাত্যহিক জীবনচর্চা। সৌজন্য ও শিষ্টাচারের বৈশিষ্ট্য : ১) জীবনবিকাশে র ক্ষেত্রে শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধ অপরিহার্য । চলনে-বলনে, আচরণে, পোশাক-পরিচ্ছদে এবং ব্যক্তিত্ব, আভিজাত্য ও চারিত্রিক দীপ্তি প্রকাশেও এই গুণগুলো ক্রিয়াশীল থাকা জরুরি। ২) ঘরে বাইরে সর্বত্র শিষ্ট ও সৌজন্যমূলক আচরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শিষ্টাচার হল একটি অপরিহার্য চারিত্রিক সম্পদ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক ঐশ্বর্য । ৩) শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ নিজের অসুবিধা সত্ত্বেয় পরের সুবিধা করে দিতে উৎসুক থাকে। শুধুমাত্র  আ...

ভারতের জাতীয় সংহতি ও বিছিন্নতাবাদ

ভারতের জাতীয় সংহতি ও বিছিন্নতাবাদ নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান্ — অতুল প্রসাদ সেন  ভূমিকা : জাতীয় সংহতি হল একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি সাধারণ পরিচয় সম্পর্কে সচেতনতা। এর অর্থ হল, আমাদের মধ্যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও, আমরা এই সত্যকে স্বীকার করি যে, আমরা সবাই এক। এটি কেবল একটি জাতীয় অনুভূতি নয়, এটা সেই চেতনা যা সমস্ত উপভাষা ও বিশ্বাসের মানুষকে একই প্রচেষ্টায় একত্রিত করে। জাতীয় একীকরণের সংজ্ঞা: ডাঃ এস. রাধাকৃষ্ণ বলেছেন, national integration cannot be made by bricks and mortar, mould and hammer, but it quietly grows in people’s minds through education.1️⃣ এইচ এ গণি সংজ্ঞায়িত করেছেন, “National integration is a socio-psychological and educational process through which a feeling of unity and harmony develops in the hearts of the people and a sense of common citizenship or feeling of loyalty to the nation is fostered among them”2️⃣ এককথায়, জাতীয় সংহতির ধারণার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্...

সেই দুটি জ্বলন্ত চোখ শাস্তি চায়

“সেই দুটি জ্বলন্ত চোখ শাস্তি চায়” ক) এখানে ‘কোন্ চোখে’র কথা বলা হয়েছে? অথবা, কার কথা বলা হয়েছে? খ) সে কীরূপ শাস্তি চায়? অথবা, সে কীভাবে শাস্তি চায়, বুঝিয়ে লেখো। গ) ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক কী উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছিলেন? ঘ) লেখক তাকে কীভাবে এবং কেন সাহায্য করতে বলেছেন? ক) এখানে কোন্ ‘চোখে’র কথা বলা হয়েছে? অথবা, কার কথা বলা হয়েছে? সমাজ সচেতন প্রাবন্ধিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘হাত বাড়াও’ নিবন্ধে পঞ্চাশের মন্বন্তরের এক মর্মস্পর্শী ছবি তুলে ধরেছেন। এই রচনায় ১২-১৩ বছর বয়সি এক কঙ্কালসার দেহ-বিশিষ্ট ‘অদ্ভুত জন্তু’র মতো দেখতে এক নিরন্ন কিশোরের বর্ণনা রয়েছে। যার জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি ‘বুকের রক্ত হিম করে দেয়’। আলোচ্য উদ্ধৃতিতে এই কিশোর এবং তার জ্বলন্ত চোখের কথা বলা হয়েছে। খ) সে কীরূপ শাস্তি চায়? অথবা, সে কীভাবে শাস্তি চায় বুঝিয়ে লেখো। এই জ্বলন্ত চোখ দুটি শাস্তি চায়। শাস্তি চায় সেইসব খুনি মানুষদের, যারা শহরে, গ্রামে গঞ্জে, নগর বন্দরে ‘জীবনের গলায় মৃত্যুর ফাঁস পরাচ্ছে’। মানুষকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দিচ্ছে না। তার সরু লিকলিকে আঙুল দিয়ে সে যেন সেইসব ...

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

প্রবন্ধ রচনা : মাইকেল মধুসূদন দত্ত ভূমিকা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত একাধারে একজন মহাকবি, নাট্যকার, বাংলাভাষার সনেট প্রবর্তক ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে, এক জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। শিক্ষাজীবন : মধুসূদন দত্ত শিক্ষা গ্রহণ পর্ব শুরু হয় মায়ের তত্ত্বাবধানে সাগরদাঁড়ির পাঠশালায়। পরে সাত বছর বয়সে কলকাতা আসেন এবং খিদিরপুর স্কুলে দুবছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন।  এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কলেজের পরীক্ষায় তিনি বরাবর বৃত্তি পেতেন। এ সময় নারীশিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ সময় থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিলেত যাওয়ার। তাঁর ধারণা ছিল বিলেতে যেতে পারলেই বড় কবি হওয়া যাবে।  এই উদ্দেশ্যেই ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি খ্রিস্ট...

‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য

‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য আলোচনা করো। —২০১৫ ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য ভূমিকা : নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘ নানা রঙের দিন ’ একটি ‘ একাঙ্ক নাটকে ’র অনিন্দ্য সুন্দর উদাহরণ। এই নাটকের কাহিনী এগিয়েছে একজন জীবন সায়ন্নে আসা অভিনেতার সাফল্যে ভরা  অতীত রঙ্গিন জীবন ও বর্তমান নিঃসঙ্গ জীবনের বেদনা বিধুর স্মৃতিচারণাকে কেন্দ্র করে। ভাব-সেতু নির্মাণ : সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, নামকরণের মাধ্যমে পাঠক ও পাঠ্যের মধ্যে একটি ভাবসেতু নির্মিত হয়, যাকে অবলম্বন করে পাঠক গল্প বা নাটকের গহীনে প্রবেশের প্রেরণা পায়। নামকরণের পদ্ধতি : গল্প, কবিতা কিম্বা নাটক, সমস্ত সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রেই নামকরণ মূলত তিনভাবে হয়ে থাকে। এগুলো হল, বিষয়কেন্দ্রিক, চরিত্রকেন্দ্রিক অথবা ব্যঞ্জনাধর্মী। নানা রঙের দিন একাঙ্ক নাটকটি নামকরণের ক্ষেত্রে ব্যঞ্জনাধর্মী বিষয়টিই ব্যবহৃত হয়েছে। বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ : এই নাটকের প্রধান চরিত্র অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় দিলদারের পোশাক পরে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে মধ্যরাতে কিছুটা নেশার ঘোরে অতীত স্মৃতিচারণায় মগ্ন হয়েছে...

এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে

“এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে।” এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে। ক) কে, কখন এ কথা বলেছে? অথবা, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? খ) এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বক্তা কি বোঝাতে চেয়েছেন? গ) সমগ্র নাট্য কাহিনীর নিরিখে মন্তব্যটির তাৎপর্য আলোচনা করো। ক) কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? অথবা, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? নাট্যকার শম্ভু মিত্রের লেখা ‘বিভাব’ নাটকের শেষ পর্বে দেখা যায় ‘হাসির খোরাক’ খুঁজতে শম্ভু মিত্র ও অমর গাঙ্গুলী পথে নামছেন। কারণ, তাদের ধারণা হয়, চার দেয়াল-এর বাইরে — রাস্তায় কিংবা মাঠে-ঘাটে রয়েছে ‘হাসির খোরাক’। কিন্তু একটু এগোতেই তাঁরা দেখতে পান, অন্য বস্ত্রের দাবিতে এগিয়ে আসছে একটি মিছিল। পুলিশের মানা অগ্রাহ্য করায় পুলিশ সেই মিছিলে গুলি চালায় এবং দু’জন ছেলেমেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এই ঘটনা শম্ভু মিত্রকে প্রবলভাবে আঘাত করে। তিনি উপলব্ধি করেন, যেখানে অন্ন-বস্ত্রের দাবিতে মানুষ নিহত হয়, সেখানে হাসির খোরাক খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ। মূলত, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক শম্ভু মিত্র অমর গাঙ্গুলী ও সামনে বসে থাকা দর্শকদের উদ্দেশ্যে শ্লেষের ...

আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক

“আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক।” — ২০১৫ আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক। 🔘 অভাবের চিত্র ‘বিভাব’ নাটকে কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে লেখো। নাট্যকার শম্ভু মিত্রের লেখা ‘বিভাব’ নাটকে আমরা দেখতে পাই একজন ভদ্রলোক সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্র ঘেঁটে শম্ভু মিত্রের লেখা নাটকের নাম দিয়েছেন ‘বিভাব’। ‘বিভাব’ শব্দের অর্থ হল, মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া শোক, হাস্য, রাগ, রতি, আনন্দ ইত্যাদি নয়টি রসানুভূতির হেতু বা কারণ। কিন্তু নিজের নাট্য ভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই নামের বিরোধ খুঁজে পেয়েছিলেন নাট্যকার শম্ভু মিত্র। প্রবল অভাব থেকেই তাদের এই নাটকের জন্ম। তাই, নাট্যকারের মনে হয়েছে, তাদের এই নাটকের নাম ‘বিভব’ নয়, হওয়া উচিত ‘অভাব নাটক’। একটি নাটকের সুস্থ উপস্থাপনা এবং ভালো প্রযোজনার জন্য দরকার হয় ভালো মঞ্চ, দৃশ্য অনুযায়ী মঞ্চসজ্জা, দৃশ্যপট, আলোক প্রক্ষেপণের কৃৎকৌশল ইত্যাদি। কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্য নাটক অভিনয়ে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর এ কারণে, এই নাটক মঞ্চস্থ করার সময় কোন ভাল মঞ্চ ছিল না, ছিলনা আলো বা ঝালর জাতীয় মঞ্চ সজ্জার বিভিন্ন উপকরণ। থাকার মধ্যে ছিল শুধু নাটক...

রচনা : মৃণাল সেন

প্রবন্ধ রচনা : মৃণাল সেন ভূমিকা : মৃণাল সেন ছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও লেখক। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে এক বন্ধনীতে উচ্চারিত হতো তার নামও। জন্ম ও শিক্ষাজীবন :  মৃণাল সেন ১৯২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম । এখানেই তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। এর পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশোনা করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। প্রাথমিক কর্ম :  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সাংবাদিকতা, ওষুধ বিপণনকারী হিসাবে কাজ শুরু করেন। চল্লিশের দশকে মৃণাল সেন ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর চলচ্চিত্রে শব্দকুশলী হিসেবেও কাজ শুরু করেন। রাজনৈতিক দর্শন :  আজীবন বামপন্থায় বিশ্বাসী মৃণাল সেন দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য হিসেবে ভারতের পার্লামেন্টের সদস্য হন। ছবি পরিচালনা : বাংলা, ওড়ইয়আ, হিন্দি এবং তেলেগু ভাষায় চলচ্চিত্র পরিচালনা করে তিনি বহুভাষিক চিত্র পরিচালক হিসেবে খ্যাতি...