সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিজ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কার

 বিজ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কার

বিজ্ঞান কী?

ল্যাটিন শব্দ ‘সায়েন্টিয়া’ থেকে ইংরেজি ‘সায়েন্স’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বাংলা ভাষায় ‘বিজ্ঞান’ শব্দটির অর্থ ‘বিশেষ জ্ঞান’। প্রকৃত অর্থে, বিজ্ঞান হল প্রকৃতি সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞান, যা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া যায়। যার ভিত্তিতে প্রাকৃতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা যায়। এবং যা প্রয়োগ করে কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রকৃত সত্যে পৌঁছানো যায়।

বিজ্ঞানমনস্কতা কী?

বিজ্ঞানমনস্কতা হল এক বিশেষ মানসিকতা যা প্রচলিত বিশ্বাসকে সরিয়ে রেখে মানুষকে যুক্তি, বুদ্ধি ও তথ্য দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রকৃত সত্যে পৌঁছাতে উৎসাহিত করে। সত্যে পৌঁছানোর এই পদ্ধতিকে বলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। 

বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতার উৎপত্তি :

মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই কিছু মানুষ পার্থিব নানা জটিল সমস্যার সমাধানকল্পে বিশ্বাসের পরিবর্তে কার্যকারণ সম্পর্ককে আশ্রয় করে। অর্থাৎ প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করে। এদের হাত ধরেই জন্ম নেয় বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা।

বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতার পার্থক্য :

বিজ্ঞানের সঙ্গে বিজ্ঞানমনস্কতার গভীর পার্থক্য রয়েছে। 

১) বিজ্ঞান সম্পূর্ণভাবে নৈর্ব্যক্তিক কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা প্রচন্ডভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

২) বস্তুকে নিয়েই বিজ্ঞানের কারবার। বস্তুর কোন জাত ধর্ম নাই। তাই বিজ্ঞানেরও কোন জাত ধর্ম থাকে না। কিন্তু মানুষের মন তথা চিন্তা ভাবনা জাত-ধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই তাকে কেন্দ্র করেই নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের বিজ্ঞান চিন্তা বা বিজ্ঞানমনস্কতা।

৩) বিজ্ঞান প্রকৃতি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্নিহিত নিয়মাবলী খুঁজে বার করতে চায়, তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী তা নির্ণয় করতে চায়। আর মানুষের বিজ্ঞানমনস্ক মন তাকে এই কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করে।

কুসংস্কার কী?

কুসংস্কার হল এক ধরনের প্রচলিত বিশ্বাস। এই বিশ্বাসকে ভর করে সাধারণ মানুষ প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করে। প্রকৃতির রোষ থেকে বাঁচার উপায় বের করে, যেখানে কার্যকারণ সম্পর্কের ভীত থাকে বিশ্বাসের উপর ভর করে। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে তা যাচাই বাছাই করার প্রক্রিয়া অনুপস্থিত থাকে।

সংস্কার ও কুসংস্কারের উৎপত্তি :

মনুষ্য সৃষ্টির আদিকাল থেকেই দুঃখ, কষ্ট, মৃত্যু, রোগভোগ নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ফলে আদিকাল থেকেই তারা এর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। উপায় খুঁজেছে কীভাবে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

কিছু মানুষ এ সমস্ত কিছুর পেছনে কোন অশুভ শক্তির কারসাজির কথা অনুমান করেছেন। ভেবেছেন তাকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। মানুষের এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছে কিছু আচার বিচার ও নিয়ম-কানুন। যার ভিত্তি কোন কার্যকারণ সম্পর্ক নয়। এভাবেই জন্ম নিয়েছে সংস্কার। যারা এগুলো মেনে চলে তারা সংস্কারাচ্ছন্ন কিংবা কুসংস্কারাচ্ছন্ন।

কুসংস্কারের প্রকারভেদ :

কুসংস্কারকে আমরা মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। যথা, ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয়।

ব্যক্তিগত কুসংস্কার :

ব্যক্তিগত কুসংস্কার প্রধানত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ব্যক্তি বিশেষে তা ভিন্ন হয়। যেমন, পরীক্ষার দিনে কেউ ডিম, কেউ রসগোল্লা, কেউবা কলা খায় না। যাত্রার মায়ের পিছনে ঢাকা অমলজনক ইত্যাদি ব্যক্তিগত কুসংস্কারের মধ্যে পড়ে।

সামাজিক কুসংস্কার :

সামাজিক কুসংস্কারের অন্যতম উদাহরণ হল ডাইনি, সুলক্ষণা, কুলক্ষণা সংক্রান্ত ধারণা। এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে ডাইনি সন্দেহে মানুষকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে।

ধর্মীয় কুসংস্কার :

ধর্মীয় কুসংস্কার বলতে সেইসব কুসংস্কারকে বোঝায় যেগুলোর সঙ্গে ধর্মের যুগ রয়েছে। একদা প্রচলিত সতীদাহ প্রথা, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রভৃতি ধর্মীয় কুসংস্কারের উদাহরণ।

সংস্কার ও কুসংস্কারের পার্থক্য :

যে সমস্ত আচার বিচার মানুষের মানসিক শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু কোন ক্ষতি করে না, সেগুলোকে বলা হয় সংস্কার। অন্যদিকে যা মানুষের জীবনে ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায় তাকে বলা হয় কুসংস্কার।

কুসংস্কার ও বিজ্ঞানমনস্কতার সম্পর্ক :

কুসংস্কার মূলত এক ধরনের বিশ্বাস। যার ভেতর কোনো যুক্তি কাজ করে না। অন্যদিকে, বিজ্ঞানমনস্কতা যুক্তি ও তথ্যনির্ভর এবং বিচার-বিশ্লেষণ এর আবশ্যিক শর্ত। তাই এই দুইয়ের সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। কোনো ব্যক্তি যত বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠে, তার মধ্যে কুসংস্কার তত কমতে থাকে। আর বিজ্ঞানমনস্কতা কমতে থাকলে কুসংস্কার বাড়তে থাকে।

কুসংস্কার দূরীকরণে বিজ্ঞানমনস্কতার ভূমিকা :

সংস্কার যতটা ক্ষতিকারক, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ক্ষতিকারক কুসংস্কার। কারণ, কুসংস্কার বহু ক্ষেত্রেই অমানবিক প্রথার জন্ম দেয় এবং মানুষের জীবনকে বিপজ্জনক আবর্তে ঠেলে দেয়। ফলে সমাজ পিছিয়ে পড়ে।

এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে একমাত্র বিজ্ঞান ও মানুষের বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনা ও চিন্তা। তাই সমাজে এই দুইয়ের প্রচার ও প্রসার খুবই জরুরী। কারণ, একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষই কেবল বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে বিষধর সাপে কাটা রোগীকে অ্যান্টি ভেনাম দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারে।

কুসংস্কার দূরীকরণ ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচারে ছাত্র সমাজের ভূমিকা :

হাজার হাজার বছর ধরে বয়ে বেড়ানো কুসংস্কার থেকে মানুষকে মুক্ত করা কঠিন কাজ। তবে বিজ্ঞানমনস্ক ছাত্র সমাজ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
১) কুসংস্কার কী, তা কীভাবে মানুষের ক্ষতি করে, সমাজকে পিছিয়ে দেয়, একজন ছাত্র তা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।
২) দলগতভাবে নিজ নিজ এলাকায় বাড়ি বাড়ি প্রচার করতে পারে।
৩) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যারা বিজ্ঞান চেতনার বিকাশে কাজ করে, তাদের দিয়ে আলোচনা সভা ও কুসংস্কার বিরোধী প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারে।
৪) পথসভা, পথনাটিকা করতে পারে।
৫) পোস্টার, ফেস্টুন, প্লাকার্ড নিয়ে শোভাযাত্রা, মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করতে পারে।

উপসংহার :

বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে কুসংস্কারের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। বিজ্ঞানমনস্কতাকে হাতিয়ার করে বিজ্ঞানকে গ্রহণ করতে পারলেই কুসংস্কারকে অতিক্রম করা যায়। মানব সমাজকে উন্নততর জীবন ব্যবস্থা উপহার দেওয়া সম্ভব হয়। তাই বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসারে ছাত্র সমাজের পাশাপাশি, আমজনতা এবং বিশেষ করে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। স্কুলের পাঠক্রমে  বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসারের সহায়ক হয় এমন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জোর দিতে হবে। তবেই আমাদের দেশ সত্যিকারে উন্নত ও প্রগতিশীল হয়ে উঠবে। জগত সভায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।

মন্তব্যসমূহ

বাংলা বই : দ্বাদশ শ্রেণি - সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রশ্নোত্তর

প্রবন্ধ : ভগিনী নিবেদিতা

ভগিনী নিবেদিতা ভূমিকা : ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ভগিনী নিবেদিতার নাম। পৈত্রিক সূত্রে তিনি ছিলেন স্কচ। আধুনিক ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী ও ধর্মনেতা স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতবর্ষে আসেন। ব্রহ্মচর্যে দীক্ষা নেন। ভারতে সমাজ সেবা ও নারী শিক্ষার প্রসারেও নিবেদিতার ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জন্ম ও বংশ পরিচয় : ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ অক্টোবর উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডানগ্যানন শহরে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল ছিলেন ধর্মযাজক। মায়ের নাম মেরি ইসাবেলা। মাত্র দশ বছর বয়সে মার্গারেটের বাবা মারা যান। তারপর তাঁর দাদামশাই তথা আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হ্যামিলটন তাঁকে লালনপালন করেন। শিক্ষাজীবন : মার্গারেট লন্ডনের চার্চ বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। এরপর হ্যালিফ্যাক্স কলেজে তিনি ও তাঁর বোন মেরি পড়াশোনা করেছিলেন। কর্মজীবন : ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে, সতেরো বছর বয়সে শিক্ষাজীবন শেষ করে মার্গারেট শিক্ষিকার পেশা গ্রহণ করেন। দু’বছরের জন্যে কেসউইকের একটি প্রাইভেট স্কুলে পড়ান। এরপরে একে ...

ছাত্র জীবনে সৌজন্য ও শিষ্টাচার

ছাত্র জীবনের সৌজন্য ও শিষ্টাচার মানব জীবনে শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভদ্রতা আত্মীয়তার চেয়ে কিছু কম এবং সামাজিকতার চেয়ে কিছু বেশি। - ইন্দিরাদেবী চৌধুরাণী ভূমিকা? ইংরেজীতে যাকে বলে Etiquette; good manners; formality; বাংলায় তাকেই বলে শিষ্টাচার। মানবজীবনের অত্যাবশ্যক গুণাবলির অন্যতম হল এই সৌজন্য ও শিষ্টাচার। দেহের সৌন্দর্ৎ বৃদ্ধি পায় যেমন অলঙ্কারে, তেমনি আত্মার সৌন্দর্য বাড়ে শিষ্টাচারে। অলঙ্কার বাইরের সামগ্রী আর শিষ্টাচার অন্তরের। এবং সৌজন্যবোধ হলো তার মার্জিত প্রাত্যহিক জীবনচর্চা। সৌজন্য ও শিষ্টাচারের বৈশিষ্ট্য : ১) জীবনবিকাশে র ক্ষেত্রে শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধ অপরিহার্য । চলনে-বলনে, আচরণে, পোশাক-পরিচ্ছদে এবং ব্যক্তিত্ব, আভিজাত্য ও চারিত্রিক দীপ্তি প্রকাশেও এই গুণগুলো ক্রিয়াশীল থাকা জরুরি। ২) ঘরে বাইরে সর্বত্র শিষ্ট ও সৌজন্যমূলক আচরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শিষ্টাচার হল একটি অপরিহার্য চারিত্রিক সম্পদ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক ঐশ্বর্য । ৩) শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ নিজের অসুবিধা সত্ত্বেয় পরের সুবিধা করে দিতে উৎসুক থাকে। শুধুমাত্র  আ...

ভারতের জাতীয় সংহতি ও বিছিন্নতাবাদ

ভারতের জাতীয় সংহতি ও বিছিন্নতাবাদ নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান্ — অতুল প্রসাদ সেন  ভূমিকা : জাতীয় সংহতি হল একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি সাধারণ পরিচয় সম্পর্কে সচেতনতা। এর অর্থ হল, আমাদের মধ্যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও, আমরা এই সত্যকে স্বীকার করি যে, আমরা সবাই এক। এটি কেবল একটি জাতীয় অনুভূতি নয়, এটা সেই চেতনা যা সমস্ত উপভাষা ও বিশ্বাসের মানুষকে একই প্রচেষ্টায় একত্রিত করে। জাতীয় একীকরণের সংজ্ঞা: ডাঃ এস. রাধাকৃষ্ণ বলেছেন, national integration cannot be made by bricks and mortar, mould and hammer, but it quietly grows in people’s minds through education.1️⃣ এইচ এ গণি সংজ্ঞায়িত করেছেন, “National integration is a socio-psychological and educational process through which a feeling of unity and harmony develops in the hearts of the people and a sense of common citizenship or feeling of loyalty to the nation is fostered among them”2️⃣ এককথায়, জাতীয় সংহতির ধারণার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্...

সেই দুটি জ্বলন্ত চোখ শাস্তি চায়

“সেই দুটি জ্বলন্ত চোখ শাস্তি চায়” ক) এখানে ‘কোন্ চোখে’র কথা বলা হয়েছে? অথবা, কার কথা বলা হয়েছে? খ) সে কীরূপ শাস্তি চায়? অথবা, সে কীভাবে শাস্তি চায়, বুঝিয়ে লেখো। গ) ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক কী উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছিলেন? ঘ) লেখক তাকে কীভাবে এবং কেন সাহায্য করতে বলেছেন? ক) এখানে কোন্ ‘চোখে’র কথা বলা হয়েছে? অথবা, কার কথা বলা হয়েছে? সমাজ সচেতন প্রাবন্ধিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘হাত বাড়াও’ নিবন্ধে পঞ্চাশের মন্বন্তরের এক মর্মস্পর্শী ছবি তুলে ধরেছেন। এই রচনায় ১২-১৩ বছর বয়সি এক কঙ্কালসার দেহ-বিশিষ্ট ‘অদ্ভুত জন্তু’র মতো দেখতে এক নিরন্ন কিশোরের বর্ণনা রয়েছে। যার জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি ‘বুকের রক্ত হিম করে দেয়’। আলোচ্য উদ্ধৃতিতে এই কিশোর এবং তার জ্বলন্ত চোখের কথা বলা হয়েছে। খ) সে কীরূপ শাস্তি চায়? অথবা, সে কীভাবে শাস্তি চায় বুঝিয়ে লেখো। এই জ্বলন্ত চোখ দুটি শাস্তি চায়। শাস্তি চায় সেইসব খুনি মানুষদের, যারা শহরে, গ্রামে গঞ্জে, নগর বন্দরে ‘জীবনের গলায় মৃত্যুর ফাঁস পরাচ্ছে’। মানুষকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দিচ্ছে না। তার সরু লিকলিকে আঙুল দিয়ে সে যেন সেইসব ...

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

প্রবন্ধ রচনা : মাইকেল মধুসূদন দত্ত ভূমিকা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত একাধারে একজন মহাকবি, নাট্যকার, বাংলাভাষার সনেট প্রবর্তক ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে, এক জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। শিক্ষাজীবন : মধুসূদন দত্ত শিক্ষা গ্রহণ পর্ব শুরু হয় মায়ের তত্ত্বাবধানে সাগরদাঁড়ির পাঠশালায়। পরে সাত বছর বয়সে কলকাতা আসেন এবং খিদিরপুর স্কুলে দুবছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন।  এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কলেজের পরীক্ষায় তিনি বরাবর বৃত্তি পেতেন। এ সময় নারীশিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ সময় থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিলেত যাওয়ার। তাঁর ধারণা ছিল বিলেতে যেতে পারলেই বড় কবি হওয়া যাবে।  এই উদ্দেশ্যেই ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি খ্রিস্ট...

‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য

‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য আলোচনা করো। —২০১৫ ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য ভূমিকা : নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘ নানা রঙের দিন ’ একটি ‘ একাঙ্ক নাটকে ’র অনিন্দ্য সুন্দর উদাহরণ। এই নাটকের কাহিনী এগিয়েছে একজন জীবন সায়ন্নে আসা অভিনেতার সাফল্যে ভরা  অতীত রঙ্গিন জীবন ও বর্তমান নিঃসঙ্গ জীবনের বেদনা বিধুর স্মৃতিচারণাকে কেন্দ্র করে। ভাব-সেতু নির্মাণ : সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, নামকরণের মাধ্যমে পাঠক ও পাঠ্যের মধ্যে একটি ভাবসেতু নির্মিত হয়, যাকে অবলম্বন করে পাঠক গল্প বা নাটকের গহীনে প্রবেশের প্রেরণা পায়। নামকরণের পদ্ধতি : গল্প, কবিতা কিম্বা নাটক, সমস্ত সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রেই নামকরণ মূলত তিনভাবে হয়ে থাকে। এগুলো হল, বিষয়কেন্দ্রিক, চরিত্রকেন্দ্রিক অথবা ব্যঞ্জনাধর্মী। নানা রঙের দিন একাঙ্ক নাটকটি নামকরণের ক্ষেত্রে ব্যঞ্জনাধর্মী বিষয়টিই ব্যবহৃত হয়েছে। বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ : এই নাটকের প্রধান চরিত্র অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় দিলদারের পোশাক পরে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে মধ্যরাতে কিছুটা নেশার ঘোরে অতীত স্মৃতিচারণায় মগ্ন হয়েছে...

আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক

“আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক।” — ২০১৫ আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক। 🔘 অভাবের চিত্র ‘বিভাব’ নাটকে কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে লেখো। নাট্যকার শম্ভু মিত্রের লেখা ‘বিভাব’ নাটকে আমরা দেখতে পাই একজন ভদ্রলোক সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্র ঘেঁটে শম্ভু মিত্রের লেখা নাটকের নাম দিয়েছেন ‘বিভাব’। ‘বিভাব’ শব্দের অর্থ হল, মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া শোক, হাস্য, রাগ, রতি, আনন্দ ইত্যাদি নয়টি রসানুভূতির হেতু বা কারণ। কিন্তু নিজের নাট্য ভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই নামের বিরোধ খুঁজে পেয়েছিলেন নাট্যকার শম্ভু মিত্র। প্রবল অভাব থেকেই তাদের এই নাটকের জন্ম। তাই, নাট্যকারের মনে হয়েছে, তাদের এই নাটকের নাম ‘বিভব’ নয়, হওয়া উচিত ‘অভাব নাটক’। একটি নাটকের সুস্থ উপস্থাপনা এবং ভালো প্রযোজনার জন্য দরকার হয় ভালো মঞ্চ, দৃশ্য অনুযায়ী মঞ্চসজ্জা, দৃশ্যপট, আলোক প্রক্ষেপণের কৃৎকৌশল ইত্যাদি। কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্য নাটক অভিনয়ে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর এ কারণে, এই নাটক মঞ্চস্থ করার সময় কোন ভাল মঞ্চ ছিল না, ছিলনা আলো বা ঝালর জাতীয় মঞ্চ সজ্জার বিভিন্ন উপকরণ। থাকার মধ্যে ছিল শুধু নাটক...

এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে

“এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে।” এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে। ক) কে, কখন এ কথা বলেছে? অথবা, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? খ) এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বক্তা কি বোঝাতে চেয়েছেন? গ) সমগ্র নাট্য কাহিনীর নিরিখে মন্তব্যটির তাৎপর্য আলোচনা করো। ক) কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? অথবা, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? নাট্যকার শম্ভু মিত্রের লেখা ‘বিভাব’ নাটকের শেষ পর্বে দেখা যায় ‘হাসির খোরাক’ খুঁজতে শম্ভু মিত্র ও অমর গাঙ্গুলী পথে নামছেন। কারণ, তাদের ধারণা হয়, চার দেয়াল-এর বাইরে — রাস্তায় কিংবা মাঠে-ঘাটে রয়েছে ‘হাসির খোরাক’। কিন্তু একটু এগোতেই তাঁরা দেখতে পান, অন্য বস্ত্রের দাবিতে এগিয়ে আসছে একটি মিছিল। পুলিশের মানা অগ্রাহ্য করায় পুলিশ সেই মিছিলে গুলি চালায় এবং দু’জন ছেলেমেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এই ঘটনা শম্ভু মিত্রকে প্রবলভাবে আঘাত করে। তিনি উপলব্ধি করেন, যেখানে অন্ন-বস্ত্রের দাবিতে মানুষ নিহত হয়, সেখানে হাসির খোরাক খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ। মূলত, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক শম্ভু মিত্র অমর গাঙ্গুলী ও সামনে বসে থাকা দর্শকদের উদ্দেশ্যে শ্লেষের ...

রচনা : মৃণাল সেন

প্রবন্ধ রচনা : মৃণাল সেন ভূমিকা : মৃণাল সেন ছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও লেখক। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে এক বন্ধনীতে উচ্চারিত হতো তার নামও। জন্ম ও শিক্ষাজীবন :  মৃণাল সেন ১৯২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম । এখানেই তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। এর পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশোনা করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। প্রাথমিক কর্ম :  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সাংবাদিকতা, ওষুধ বিপণনকারী হিসাবে কাজ শুরু করেন। চল্লিশের দশকে মৃণাল সেন ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর চলচ্চিত্রে শব্দকুশলী হিসেবেও কাজ শুরু করেন। রাজনৈতিক দর্শন :  আজীবন বামপন্থায় বিশ্বাসী মৃণাল সেন দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য হিসেবে ভারতের পার্লামেন্টের সদস্য হন। ছবি পরিচালনা : বাংলা, ওড়ইয়আ, হিন্দি এবং তেলেগু ভাষায় চলচ্চিত্র পরিচালনা করে তিনি বহুভাষিক চিত্র পরিচালক হিসেবে খ্যাতি...

এবার শান্তি

“এবার শান্তি।” ক) এ শান্তি কীভাবে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে? খ) কেনই বা লেখক শান্তি প্রার্থনা করেছেন তা বুঝিয়ে লেখো। ক) এ শান্তি কীভাবে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে? সমাজ সচেতন প্রাবন্ধিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের ‘হাত বাড়াও’ নিবন্ধে পঞ্চাশের মন্বন্তরের এক হৃদয় বিদারক ও মর্মস্পর্শী ছবি তুলে ধরেছেন। এই রচনায় ১২-১৩ বছর বয়সি এক কঙ্কালসার দেহ-বিশিষ্ট ‘অদ্ভুত জন্তু’র মতো দেখতে একজন নিরন্ন কিশোরের বর্ণনা রয়েছে। যার জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি ‘বুকের রক্ত হিম করে দেয়’। লেখকের বিশ্লেষণে, তার এই জলন্ত চোখ দুটি শাস্তি চায়। শাস্তি চায় সেইসব খুনি মানুষদের, যারা শহরে, গ্রামে গঞ্জে, নগর বন্দরে ‘জীবনের গলায় মৃত্যুর ফাঁস পরাচ্ছে’। মানুষকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দিচ্ছে না। সেই সঙ্গে সে চেয়েছে, এই শাস্তি আসুক শান্তির বার্তায় ভর করে। কামনা করেছে, বাংলার বুক জুড়ে সবুজ মাঠের সোনালী ফসলে ও চাষীর গোলা ভরা ধানে ভর করে সেই শান্তি আসুক। শান্তি আসুক কারখানায় কারখানায় বন্ধন মুক্ত মানুষের আন্দোলিত বাহুতে বাহু মিলনের মধ্য দিয়ে। মিলিত হোক যুদ্ধ আর অনাহারকে দূরে ঠেলে কোটি কোটি মানুষের বলিষ্ঠ হাত, স্...