সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভারতীয় গল্প : অলৌকিক - কর্তার সিং দুগ্গাল

ছোটগল্প : অলৌকিক - লিখেছেন কর্তার সিং দুগ্গাল

ছোট গল্প : ‘অলৌকিক’। লিখেছেন কর্তার সিং দুগ্গাল, কর্তার দুগ্গালের ছোটগল্প অলৌকিক।

কর্তার সিং দু গ্‌ গা ল-এর লেখা ছোটগল্প ‘অলৌকিক’

এই গল্পের প্রশ্ন উত্তর পেতে এখানে যাও

'তারপর গুরু নানক ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছোলেন হাসান আন্দালের জালে। ভয়ানক গরম পড়েছে। গনগনে রোদ। চারিদিক সুনসান। পাথরের চাঁই, ধু ধু বালি, ঝলসে যাওয়া শুকনো গাছপালা। কোথাও একটা জনমানুষ নেই।'

"তারপর কী হল মা?" আমি কৌতূহলী হয়ে উঠি।

'গুরু নানক আত্মমগ্ন হয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। হঠাৎ শিষ্য মর্দানার জল তেষ্টা পেল। কিন্তু কোথায় জল? গুৰু বললেন, ভাই মর্দানা, সবুর করো। পরের গাঁয়ে গেলেই পাবে।' কিন্তু তার কাকুতি-মিনতি শুনে গুরু নানক দুশ্চিন্তায় পড়লেন। অনেক দূর পর্যন্ত জল পাওয়া যাবে না, অথচ সে বেঁকে বসলে সবাইকেই ঝক্কি পোয়াতে হবে। গুরু বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘দ্যাখো মর্দানা, কোথাও জল নেই, খানিকক্ষণ অপেক্ষা করো। এটাকে ভগবানের অভিপ্রায় বলেই মেনে নাও।' মর্দানা তবু নড়তে রাজি নয়। সেখানেই বসে পড়ে। এগুবার আর উপায় নেই। গুরু গভীর সমস্যায় পড়লেন। মদীনার একগুঁয়েমি দেখে হাসি পেলেও সেই সঙ্গে বিরক্তও হলেন। পরিস্থিতি দেখে ধ্যানে বসলেন তিনি। চোখ খুলে দেখেন, মর্দানা তেষ্টার চোটে জল ছাড়া মাছের মতো ছটফট করছে। সদ্গুরু তখন ঠোটে হাসি ফুটিয়ে বললেন, 'ভাই মর্দানা, এখানে পাহাড়ের চুড়োয় বলী কান্ধারী নামে এক দরবেশ কুটির বেঁধে থাকেন। ওঁর কাছে জল পেতে পার। এ তল্লাটে ওঁর কুয়ো ছাড়া আর কোথাও জল নেই।

"তারপর কী হল মা?" মর্দানা জল পেল কিনা জানবার আর তর সইছিল না।

"মর্দানা শুনেই ছুটে গেল। একে তেষ্টায় কাতর, তার উপর মাথায় গনগনে রোদ। ঘেমে নেয়ে পাহাড়ে উঠছে। হাঁপাতে হাঁপাতে শেষ অবধি অনেক কষ্টে উঠতে পারল। বলী কান্ধারীকে সেলাম জানিয়ে জল চাইলে তিনি কুয়োর দিকে ইঙ্গিত করলেন। সে কুয়োর দিকে এগুলে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগল ওর মনে। জিজ্ঞেস করলেন, কোত্থেকে আসছ? মর্দানা জানায়, আমি পির নানকের সঙ্গী। ঘুরতে ঘুরতে এদিকে এসে পড়েছি। বড্ড তেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু নীচে কোথাও জল নেই।' নানকের নাম কানে যেতেই বলী রেগে তাকে সঙ্গে সঙ্গে তাড়িয়ে দিলেন। নেমে সে নালিশ জানাল। সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে গুরু হাসেন, 'মর্দানা তুমি আর একবার যাও। এবার নম্রভাবে বলবে, আমি নানক দরবেশের অনুচর'। তার ভয়ংকর তেষ্টা পেয়েছে, অন্য কোথাও জল নেই। ক্ষোভে দুঃখে বিড়বিড় করতে করতে সে আবার গেল। কিন্তু বলী কান্ধারী 'আমি কাফেরের শিষ্যকে এক গণ্ডুষ জলও দেব না” বলে এবারও তাড়িয়ে দিলেন। মর্দানা এবার যখন ফিরল, তখন রীতিমতো করুণ অবস্থা। গলা শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে, দরদর করে ঘামছে। বেশিক্ষণ বাঁচাবে কি না সন্দেহ। গুরু নানাক সব শুনে মর্দানাকে 'জ নিরঙ্কার' বলে ওঁর কাছে আর একবার যেতে বললেন। আদেশ অমান্য করতে না পেরে সে ফের রওনা দিল। যা অবস্থা, হয়তো পথেই প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। তিন বারের বার চুড়োয় পৌঁছেই মর্দানা ওঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ে। ক্রুদ্ধ ফকির এবারও কাকুতিমিনতি অগ্রাহ্য করলেন, 'ওই নানক নিজেকে পির বলে জাহির করে অধ্য চেলার জন্য সামান্য খাবার জলও জোগাড় করতে পারে না। বলী কান্ধারী যথেচ্ছ গালাগাল করলেন। মানা নেমে এসে গুরু নানকের পায়ে প্রায় মূর্ছিত হয়ে পড়ল। পিঠে হাত বুলিয়ে, সাহস জুগিয়ে উনি তাকে সামনের পাথরটা তুলতে বলেন। পাথরটা তোলায় তলা থেকে জলের ঝরণা বেরিয়ে এল। নিমেষেই চারিদিকে থৈ থৈ। ঠিক সেই সময় বলী কান্ধারীর জলের দরকার হয়েছে। দেখেন, কুয়োয় একটুও জল নেই। উনি রীতিমত হতভম্ব। ওদিকে নীচে জলস্রোত দেখা দিয়েছে। বলী কাথারী দেখলেন, গুরু নানক দূরে বাবলাতলে অনুচরসহ বসে রয়েছেন। ক্ষিপ্ত হয়ে বলী পাথরের একখানা চাওড় নীচে গড়িয়ে দেন। দৃশ্যটা দেখে মর্দানা চেঁচিয়ে উঠতেই গুরু নানক শান্ত স্বরে 'জয় নিরঙ্কার' ধ্বনি দিতে বলেন। কাছে আসতেই উনি হাত দিয়ে পাথরটা থামিয়ে দিলেন। হাসান আব্দালে এখন যার নাম 'পাঞ্জা সাহের', গুরু নানকের হাতের ছাপ ওতে আজও লেগে রয়েছে।

গল্পটা শুনতে বেশ ভালো লাগছিল। কিন্তু হাত দিয়ে পাথরের চাঙড় থামিয়ে দেবার ব্যাপারটা মেজাজ। বিগড়ে দিল। এ কি আদৌ সম্ভব? একটা মানুষ কীভাবে পাথরের চাঙড় থামিয়ে দেবে? ওতে কিনা আছে। হাতের ছাপ লেগে আছে। বিশ্বাস হল না, মনে হয় পরে কেউ খোদাই করেছে, মা-র সঙ্গে তর্ক শুরু করি। পাথরের তলা থেকে জল বেরিয়ে আসার ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জালের উৎস আবিষ্কার করা যেতে পারে। কিন্তু পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া চাঙড় হাত দিয়ে থামিয়ে দেওয়া কিছুতেই বিশ্বাস হল না। মুখের ভঙ্গিতে মনের ভাবটা ফুটে ওঠায় মা চুপ করে গেলেন।

'গড়িয়ে পড়া পাথর কীভাবে থামবে?’ গল্পটা মনে পড়লেই হাসি পেত।

গল্পটা বার কয়েক গুরুধারেতেও শুনেছি। কিন্তু এই ব্যাপারটাতে সবসময়েই মাথা বাঁকিয়েছি। এটা অসম্ভব।

গল্পটা আমাদের স্কুলে শোনানো হল। পাথরের ব্যাপারটা নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গোও তর্ক করলাম। ‘যারা পারে তাদের পক্ষে মোটেই অসম্ভব না’ বলে উনি আমাকে চুপ করিয়ে দিলেন।

তবু বিশ্বাস হল না। পাথরের চাঙড় কেউ থামাতে পারে? আমার চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছা করত।

কিছুদিন পর শুনলাম, পাঞ্জাসাহেবে 'সারা' হয়েছে। সেকালে ঘনঘন সাকা' হত। কোথাও সাকা হলেই ভুঝতে পারতাম, বাড়িতে অরন্ধন। রাতে মেঝেতে শুতে হবে। তবে সাকা আসলে কী, তখন জানতাম না।

আমাদের গাঁ থেকে পাণ্যাসাহেব তেমন দূরে না। সাকার খবর পাওয়া মাত্র মা পাঞ্জাসাহেবের দিকে রওনা দিল। সঙ্গে আমি আর আমার ছোটোবোন। সারাটা পথ ধরে মা কেঁদেছিল। সাকার ব্যাপারটা কী, সারাক্ষ ধরে তাই ভাবছি। পান্থাসাহেবে পৌঁছে এক আশ্চর্য ঘটনার কথা জানতে পারি।

দূরের শহরের ফিরিশিরা নিরন্ধ ভারতীয়দের উপর গুলি করেছে। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই আছে মৃত্যুদের মধ্যে। বাকিদের অন্য শহরের জেলে পাঠানো হচ্ছে। কয়েদিদের যদিও খিদে-তেষ্টার সব মরার মতো অবস্থা, তাও হুকুম হয়েছে, তাদের ট্রেন যেন কোথাও না থামে। পাণ্ডা সাহেবের লোকজন ঘরটা পেয়ে সবাই উত্তেজিত।

পাঞ্জা সাহোরেই গুরু নানক মর্দানার তেষ্টা মিটিয়েছিলেন। সেই শহর দিয়ে খিলে তেষ্টায় কাতর কয়েদিদের ট্রেন যাবে এ হতে পারে না। ঠিক হল, ট্রেনটা থামানো হবে। স্টেশনমাস্টারের কাছে আবেদন জানানো হল। টেলিফোন, টেলিগ্রাম গেল। তবু ফিরিঙ্গিদের হুকুম, কিছুতেই ট্রেনটাকে থামানো যাবে না। এদিকে ট্রেনের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামী, দেশপ্রেমিকেরা গিদের কাতর। জল, রুটির ব্যবস্থা নেই। সেখানে ট্রেন থামানোর কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তবু লোকজন ট্রেন থামাতে বহুপরিকর। শহরবাসীরা তাই স্টেশনে রুটি, পায়েস, লুচি-ডাল ডাঁই করে রাখে।

কিন্তু ট্রেনটা ঝড়ের বেগে স্টেশন পেরিয়ে যাবে। কী করা যায়?

মায়ের বান্ধবী আমাদের সমস্ত ঘটনাটা শোনালেন, “রেললাইনে আমার ছেলেপুলের বাবা ও তারপর এঁর সঙ্গীরা শুয়ে পড়লেন। ওঁদের পেছনে এক-একজন করে আমরা বউ ও বাচ্চারা। তীক্ষ্ণ হুইসেল দিতে দিতে ট্রেন এল। গতি আগেই কমিয়েছে কিন্তু থামল অনেক দূরে এসে। দেখি ওর বুকের উপর দিয়ে ঢাকা, তারপর এ সঙ্গীদের বুকের উপর দিয়ে আমি চোখ বুজলাম। চোখ খুলে দেখি ট্রেনটা একেবারে আমার মাথার কাছে এসে ঘেমেছে। পাশে শুয়ে থাকা সকলের বুক থেকে জয় নিরঙ্কার ধ্বনি বেরচ্ছে। ট্রেনটা পিছোতে লাগল, লাশগুলো কেটে দুমড়ে মুচড়ে গেল। স্বচক্ষে দেখেছি, খালপারের সেতুটির দিকে রক্তের স্রোত।

অবার-বিহ্বল বসে আছি, মুখে কথা নেই। সারাদিন একফোঁটা জলও মুখে নিতে পারিনি।

সন্ধ্যায় ফেরার পথে মা ছোটোবোনকে পান্থাসাহেবের গল্প বলছিল। গুরু নানক মর্দানার সঙ্গে কীভাবে এ রাস্তায় এসেছিলেন। তেষ্টা পেলে গুরু নানক কোন পরিস্থিতিতে তাকে বলী কাথারীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। বলী কাথারী কীভাবে তিন-তিনবার মর্দানাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। গুরু নানক তাকে কখন পাথর তুলতে বলেন। কীভাবে মাটি ফুঁড়ে ঝরনা বেরিয়ে আসে। তাতে বলী কান্ধারী ক্ষিপ্ত হয়ে পাথরের বড়ো চাওড় গড়িয়ে দেয়। মর্দানা খাবড়ে গেলেও গুরু নানক 'জয় নিরঙ্কার' বলে কীভাবে হাত দিয়ে সেটা থামিয়ে দেন। শুনতে-শুনতে ছোটোবোন মাকে বাধা দিল, 'কিন্তু একটা মানুষ কীভাবে পাঘরের এত বড়ো একটা চাঙড় থামাবে?" অমনি আমি বলে উঠি, ঝড়ের বেগে ছুটে আসা ট্রেন থামানো গেল, পাথরের চাঁই থামানো যাবে না কেন?? আমার চোখে জল। কোনো কিছুর পরোয়া না করে, জীবন তুচ্ছ করে ট্রেন থামিয়ে যারা খিদে তেষ্টায় কাতর দেশবাসীকে। রুটিজল পৌঁছে দিয়েছিল, চোখের জলটা তাদের জন্য।
-------xx-----

ভাষান্তর : অনিন্দ্য সৌরভ

এই গল্পের প্রশ্ন উত্তর পেতে এখানে যাও

মন্তব্যসমূহ

বাংলা বই : দ্বাদশ শ্রেণি - সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রশ্নোত্তর

সেই দুটি জ্বলন্ত চোখ শাস্তি চায়

“সেই দুটি জ্বলন্ত চোখ শাস্তি চায়” ক) এখানে ‘কোন্ চোখে’র কথা বলা হয়েছে? অথবা, কার কথা বলা হয়েছে? খ) সে কীরূপ শাস্তি চায়? অথবা, সে কীভাবে শাস্তি চায়, বুঝিয়ে লেখো। গ) ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক কী উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছিলেন? ঘ) লেখক তাকে কীভাবে এবং কেন সাহায্য করতে বলেছেন? ক) এখানে কোন্ ‘চোখে’র কথা বলা হয়েছে? অথবা, কার কথা বলা হয়েছে? সমাজ সচেতন প্রাবন্ধিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘হাত বাড়াও’ নিবন্ধে পঞ্চাশের মন্বন্তরের এক মর্মস্পর্শী ছবি তুলে ধরেছেন। এই রচনায় ১২-১৩ বছর বয়সি এক কঙ্কালসার দেহ-বিশিষ্ট ‘অদ্ভুত জন্তু’র মতো দেখতে এক নিরন্ন কিশোরের বর্ণনা রয়েছে। যার জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি ‘বুকের রক্ত হিম করে দেয়’। আলোচ্য উদ্ধৃতিতে এই কিশোর এবং তার জ্বলন্ত চোখের কথা বলা হয়েছে। খ) সে কীরূপ শাস্তি চায়? অথবা, সে কীভাবে শাস্তি চায় বুঝিয়ে লেখো। এই জ্বলন্ত চোখ দুটি শাস্তি চায়। শাস্তি চায় সেইসব খুনি মানুষদের, যারা শহরে, গ্রামে গঞ্জে, নগর বন্দরে ‘জীবনের গলায় মৃত্যুর ফাঁস পরাচ্ছে’। মানুষকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দিচ্ছে না। তার সরু লিকলিকে আঙুল দিয়ে সে যেন সেইসব ...

ছাত্র জীবনে সৌজন্য ও শিষ্টাচার

ছাত্র জীবনের সৌজন্য ও শিষ্টাচার মানব জীবনে শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভদ্রতা আত্মীয়তার চেয়ে কিছু কম এবং সামাজিকতার চেয়ে কিছু বেশি। - ইন্দিরাদেবী চৌধুরাণী ভূমিকা? ইংরেজীতে যাকে বলে Etiquette; good manners; formality; বাংলায় তাকেই বলে শিষ্টাচার। মানবজীবনের অত্যাবশ্যক গুণাবলির অন্যতম হল এই সৌজন্য ও শিষ্টাচার। দেহের সৌন্দর্ৎ বৃদ্ধি পায় যেমন অলঙ্কারে, তেমনি আত্মার সৌন্দর্য বাড়ে শিষ্টাচারে। অলঙ্কার বাইরের সামগ্রী আর শিষ্টাচার অন্তরের। এবং সৌজন্যবোধ হলো তার মার্জিত প্রাত্যহিক জীবনচর্চা। সৌজন্য ও শিষ্টাচারের বৈশিষ্ট্য : ১) জীবনবিকাশে র ক্ষেত্রে শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধ অপরিহার্য । চলনে-বলনে, আচরণে, পোশাক-পরিচ্ছদে এবং ব্যক্তিত্ব, আভিজাত্য ও চারিত্রিক দীপ্তি প্রকাশেও এই গুণগুলো ক্রিয়াশীল থাকা জরুরি। ২) ঘরে বাইরে সর্বত্র শিষ্ট ও সৌজন্যমূলক আচরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শিষ্টাচার হল একটি অপরিহার্য চারিত্রিক সম্পদ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক ঐশ্বর্য । ৩) শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ নিজের অসুবিধা সত্ত্বেয় পরের সুবিধা করে দিতে উৎসুক থাকে। শুধুমাত্র  আ...

সহমরণ — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

সহমরণ — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সহমরণ — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘জিজ্ঞাসি’ছ পড়া কেন গা’? শুনিবে তা’? — শোন তবে মা — দুখের কথা ব’ল্ ব কা’রে বা! ************************* জন্ম আমার হিদুঁর ঘরে, বাপের ঘরে, খুব আদরে, ছিলাম বছর দশ; কুলীন পিতা, কুলের গোলে, ফেলে দিলেন বুড়ার গলে; হ’লাম পরের বশ। আচারে তার আস্ ত হাসি, — ব’লব কি আর পরকাশি, — মিটল সকল সাধ; — হিঁদুর মেয়ে অনেক ক’রে শ্রদ্ধা রাখে স্বামীর ’পরে তা’তেও বিধির বাদ। বুড়াকালের অত্যাচারে,— শয্যাশায়ী ক’রলে তা’রে জেগেই পোহাই রাতি; দিন কাটেত’ কাটে না রাত, মাসের পরে গেল হঠাৎ, — নিবল জীবন বাতি। ********************** কতক দুঃখে, কতক ভয়ে শরীর এল অবশ হ’য়ে ভাঙল সুখের হাট খ’য়ের রাশি ছড়িয়ে পথে, চল্ ল নিয়ে শবের সাথে,— যেথায় শ্মশান ঘাট। গুঁড়িয়ে শাঁখা, সবাই মিলে, চিতায় মোরে বসিয়ে দিলে, বাজ্ ল শতেক শাঁক; লোকের ভিড়ে ভরেছে ঘাট, ধুঁইয়ে উঠে চিতার কাঠ, উঠ্ল গর্জ্জে ঢাক। ******************** রোমে, রোমে, শিরায়, শিরায়, জ্বালা ধরে, —প্রাণ বাহিরায়,— মরি বুঝি ধোঁয়ায় এবার! আচম্বিতে—চিৎকার রোলে— চিতা ভেঙে, পড়িলাম জলে, মাঝি এক নিল নায়ে তার। যত লোক করে ‘মার ...

প্রবন্ধ : ভগিনী নিবেদিতা

ভগিনী নিবেদিতা ভূমিকা : ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ভগিনী নিবেদিতার নাম। পৈত্রিক সূত্রে তিনি ছিলেন স্কচ। আধুনিক ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী ও ধর্মনেতা স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতবর্ষে আসেন। ব্রহ্মচর্যে দীক্ষা নেন। ভারতে সমাজ সেবা ও নারী শিক্ষার প্রসারেও নিবেদিতার ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জন্ম ও বংশ পরিচয় : ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ অক্টোবর উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডানগ্যানন শহরে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল ছিলেন ধর্মযাজক। মায়ের নাম মেরি ইসাবেলা। মাত্র দশ বছর বয়সে মার্গারেটের বাবা মারা যান। তারপর তাঁর দাদামশাই তথা আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হ্যামিলটন তাঁকে লালনপালন করেন। শিক্ষাজীবন : মার্গারেট লন্ডনের চার্চ বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। এরপর হ্যালিফ্যাক্স কলেজে তিনি ও তাঁর বোন মেরি পড়াশোনা করেছিলেন। কর্মজীবন : ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে, সতেরো বছর বয়সে শিক্ষাজীবন শেষ করে মার্গারেট শিক্ষিকার পেশা গ্রহণ করেন। দু’বছরের জন্যে কেসউইকের একটি প্রাইভেট স্কুলে পড়ান। এরপরে একে ...

‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য

‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য আলোচনা করো। —২০১৫ ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য ভূমিকা : নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘ নানা রঙের দিন ’ একটি ‘ একাঙ্ক নাটকে ’র অনিন্দ্য সুন্দর উদাহরণ। এই নাটকের কাহিনী এগিয়েছে একজন জীবন সায়ন্নে আসা অভিনেতার সাফল্যে ভরা  অতীত রঙ্গিন জীবন ও বর্তমান নিঃসঙ্গ জীবনের বেদনা বিধুর স্মৃতিচারণাকে কেন্দ্র করে। ভাব-সেতু নির্মাণ : সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, নামকরণের মাধ্যমে পাঠক ও পাঠ্যের মধ্যে একটি ভাবসেতু নির্মিত হয়, যাকে অবলম্বন করে পাঠক গল্প বা নাটকের গহীনে প্রবেশের প্রেরণা পায়। নামকরণের পদ্ধতি : গল্প, কবিতা কিম্বা নাটক, সমস্ত সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রেই নামকরণ মূলত তিনভাবে হয়ে থাকে। এগুলো হল, বিষয়কেন্দ্রিক, চরিত্রকেন্দ্রিক অথবা ব্যঞ্জনাধর্মী। নানা রঙের দিন একাঙ্ক নাটকটি নামকরণের ক্ষেত্রে ব্যঞ্জনাধর্মী বিষয়টিই ব্যবহৃত হয়েছে। বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ : এই নাটকের প্রধান চরিত্র অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় দিলদারের পোশাক পরে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে মধ্যরাতে কিছুটা নেশার ঘোরে অতীত স্মৃতিচারণায় মগ্ন হয়েছে...

আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক

“আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক।” — ২০১৫ আমাদের মনে হয় এর নাম হওয়া উচিত ‘অভাব’ নাটক। 🔘 অভাবের চিত্র ‘বিভাব’ নাটকে কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে লেখো। নাট্যকার শম্ভু মিত্রের লেখা ‘বিভাব’ নাটকে আমরা দেখতে পাই একজন ভদ্রলোক সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্র ঘেঁটে শম্ভু মিত্রের লেখা নাটকের নাম দিয়েছেন ‘বিভাব’। ‘বিভাব’ শব্দের অর্থ হল, মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া শোক, হাস্য, রাগ, রতি, আনন্দ ইত্যাদি নয়টি রসানুভূতির হেতু বা কারণ। কিন্তু নিজের নাট্য ভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই নামের বিরোধ খুঁজে পেয়েছিলেন নাট্যকার শম্ভু মিত্র। প্রবল অভাব থেকেই তাদের এই নাটকের জন্ম। তাই, নাট্যকারের মনে হয়েছে, তাদের এই নাটকের নাম ‘বিভব’ নয়, হওয়া উচিত ‘অভাব নাটক’। একটি নাটকের সুস্থ উপস্থাপনা এবং ভালো প্রযোজনার জন্য দরকার হয় ভালো মঞ্চ, দৃশ্য অনুযায়ী মঞ্চসজ্জা, দৃশ্যপট, আলোক প্রক্ষেপণের কৃৎকৌশল ইত্যাদি। কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্য নাটক অভিনয়ে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর এ কারণে, এই নাটক মঞ্চস্থ করার সময় কোন ভাল মঞ্চ ছিল না, ছিলনা আলো বা ঝালর জাতীয় মঞ্চ সজ্জার বিভিন্ন উপকরণ। থাকার মধ্যে ছিল শুধু নাটক...

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

প্রবন্ধ রচনা : মাইকেল মধুসূদন দত্ত ভূমিকা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত একাধারে একজন মহাকবি, নাট্যকার, বাংলাভাষার সনেট প্রবর্তক ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে, এক জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। শিক্ষাজীবন : মধুসূদন দত্ত শিক্ষা গ্রহণ পর্ব শুরু হয় মায়ের তত্ত্বাবধানে সাগরদাঁড়ির পাঠশালায়। পরে সাত বছর বয়সে কলকাতা আসেন এবং খিদিরপুর স্কুলে দুবছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন।  এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কলেজের পরীক্ষায় তিনি বরাবর বৃত্তি পেতেন। এ সময় নারীশিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ সময় থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিলেত যাওয়ার। তাঁর ধারণা ছিল বিলেতে যেতে পারলেই বড় কবি হওয়া যাবে।  এই উদ্দেশ্যেই ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি খ্রিস্ট...

ভারতের জাতীয় সংহতি ও বিছিন্নতাবাদ

ভারতের জাতীয় সংহতি ও বিছিন্নতাবাদ নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান্ — অতুল প্রসাদ সেন  ভূমিকা : জাতীয় সংহতি হল একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি সাধারণ পরিচয় সম্পর্কে সচেতনতা। এর অর্থ হল, আমাদের মধ্যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও, আমরা এই সত্যকে স্বীকার করি যে, আমরা সবাই এক। এটি কেবল একটি জাতীয় অনুভূতি নয়, এটা সেই চেতনা যা সমস্ত উপভাষা ও বিশ্বাসের মানুষকে একই প্রচেষ্টায় একত্রিত করে। জাতীয় একীকরণের সংজ্ঞা: ডাঃ এস. রাধাকৃষ্ণ বলেছেন, national integration cannot be made by bricks and mortar, mould and hammer, but it quietly grows in people’s minds through education.1️⃣ এইচ এ গণি সংজ্ঞায়িত করেছেন, “National integration is a socio-psychological and educational process through which a feeling of unity and harmony develops in the hearts of the people and a sense of common citizenship or feeling of loyalty to the nation is fostered among them”2️⃣ এককথায়, জাতীয় সংহতির ধারণার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্...

এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে

“এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে।” এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে। ক) কে, কখন এ কথা বলেছে? অথবা, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? খ) এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বক্তা কি বোঝাতে চেয়েছেন? গ) সমগ্র নাট্য কাহিনীর নিরিখে মন্তব্যটির তাৎপর্য আলোচনা করো। ক) কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? অথবা, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা বলা হয়েছে? নাট্যকার শম্ভু মিত্রের লেখা ‘বিভাব’ নাটকের শেষ পর্বে দেখা যায় ‘হাসির খোরাক’ খুঁজতে শম্ভু মিত্র ও অমর গাঙ্গুলী পথে নামছেন। কারণ, তাদের ধারণা হয়, চার দেয়াল-এর বাইরে — রাস্তায় কিংবা মাঠে-ঘাটে রয়েছে ‘হাসির খোরাক’। কিন্তু একটু এগোতেই তাঁরা দেখতে পান, অন্য বস্ত্রের দাবিতে এগিয়ে আসছে একটি মিছিল। পুলিশের মানা অগ্রাহ্য করায় পুলিশ সেই মিছিলে গুলি চালায় এবং দু’জন ছেলেমেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এই ঘটনা শম্ভু মিত্রকে প্রবলভাবে আঘাত করে। তিনি উপলব্ধি করেন, যেখানে অন্ন-বস্ত্রের দাবিতে মানুষ নিহত হয়, সেখানে হাসির খোরাক খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ। মূলত, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক শম্ভু মিত্র অমর গাঙ্গুলী ও সামনে বসে থাকা দর্শকদের উদ্দেশ্যে শ্লেষের ...

বহুদিন জঙ্গলে কাটেনি দিন / বহুদিন জঙ্গলে যায়নি

“বহুদিন জঙ্গলে কাটেনি দিন / বহুদিন জঙ্গলে যায়নি” বহুদিন জঙ্গলে কাটেনি দিন / বহুদিন জঙ্গলে যায়নি ক) কেন কবি একথা বলেছেন? অথবা, বহুদিন জঙ্গলে যাননি বলে কবি কেন আক্ষেপ করেছেন? খ) কবি কেন জঙ্গলে যেতে চান বুঝিয়ে বলো। গ) এই অভাব পূরণের জন্য কবি কী চেয়েছেন? ঘ) বহুদিন জঙ্গলে না যাওয়ার সঙ্গে বহুদিন শহরে থাকার সম্পর্কটি নিরূপণ করো। ক) একথা বলার কারণ (আক্ষেপের কারণ) : প্রকৃতি প্রেমিক কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘ আমি দেখি ’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে। এই কবিতায় আমরা তাকে দেখতে পাই গাছ-প্রেমিক এক নাগরিক কবি হিসাবে। অর্থাৎ নাগরিক কবি হলেও তিনি ছিলেন অরণ্য প্রেমি। কারণ, তিনি জানতেন অরণ্যের সবুজের মধ্যেই রয়েছে শহরে জীবনের যান্ত্রিক ও কৃত্রিম পরিবেশে হাঁপিয়ে ওঠা নাগরিকের জন্য সঞ্জীবন সুধা। আর এ কারণেই তিনি বারবার যেতে চান অরণ্যভূমি সবুজ আঁচলের মায়াবী ছায়ায়। কিন্তু দীর্ঘ অসুস্থতা ও নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় দীর্ঘদিন তিনি তা ছুঁতে পারেননি। তাই ইচ্ছা পূরণ না হওয়ার বেদনায় তিনি হতাশ হয়েছেন। সেই হতাশার কারণেই তিনি উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেছেন। খ) জঙ্গলে যেতে চাওয়া...